চিরতরে হারিয়ে যাচ্ছে মেছোবিড়াল, সংরক্ষণের দাবি

আজ, ১ ফেব্রুয়ারি, প্রথমবারের মতো পালিত হচ্ছে মেছোবিড়াল দিবস। বাংলাদেশে জলাভূমি, বাঁওড় ও হাওর অঞ্চলে এক সময় এই নিরীহ, শান্ত প্রাণীটির বিস্তৃত বসবাস ছিল। তবে বর্তমানে মেছোবিড়াল নানা কারণে বিলুপ্তির পথে। বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, এই প্রাণীটি পরিবেশ এবং জীববৈচিত্র্যের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, তাই এর সংরক্ষণে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি।
মেছোবিড়ালের পরিচিতি ও সমস্যা
মেছোবিড়াল, বা স্থানীয় ভাষায় 'বাঘুইলা', মেছো বিড়াল (Fishing Cat) হিসেবে পরিচিত। সাধারণত জলাশয়ে মরা ও রোগাক্রান্ত মাছ খেয়ে মাছের রোগ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। এছাড়া কৃষকের উপকারিতেও আসে, কারণ এটি বিভিন্ন পোকামাকড়, ইঁদুর ও ছোট প্রাণী খেয়ে কৃষকের কাজকে সহজ করে। কিন্তু, মেছোবিড়াল সম্পর্কে ভুল ধারণা সৃষ্টি হওয়ার কারণে মানুষ এটি শত্রু হিসেবে গণ্য করে এবং হত্যা করছে।
এদিকে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে এই প্রাণীটিকে 'মেছোবাঘ' হিসেবে প্রচারিত করা হচ্ছে। 'বাঘ' শব্দটি এতে নেতিবাচক মনোভাব সৃষ্টি করছে। মেছোবিড়াল মানুষের জন্য কোন বিপদ সৃষ্টি করে না; বরং এটি মানুষ দেখলেই পালিয়ে যায়।
সংকটময় পরিস্থিতি
গত কয়েক দশক ধরে মেছোবিড়ালের সংখ্যা দ্রুত কমে গেছে। মানুষের সঙ্গে দ্বন্দ্ব বাড়ছে এবং অনেক সময় প্রাণীটি হত্যা করা হচ্ছে। ২০০৫ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত এক গবেষণায় দেখা যায়, ৩৬১টি সংবাদ সংগ্রহ করা হয়েছে, যার মধ্যে ১৬০টি ছিল মেছোবিড়াল হত্যার খবর। প্রায় ৮৩ শতাংশ সংবাদে মেছোবিড়ালকে বাঘ বা বাঘের বাচ্চা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
গবেষণা এবং উদ্যোগের অভাব
বন বিভাগের তরফে কিছু সময় আগে মেছোবিড়ালের সংরক্ষণে গবেষণা শুরু হয়েছিল, কিন্তু তা থেমে যায়। ২০২৩ সালে একটি মেছোবিড়ালের গলায় স্যাটেলাইট কলার বসিয়ে প্রকৃতিতে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু এক মাসও না পেরোতেই কৃষকের হাতে প্রাণীটি হত্যা হয়। এর ফলে মেছোবিড়াল সংরক্ষণে যে জোরালো উদ্যোগ প্রয়োজন, তা বাস্তবায়িত হয়নি।
আইনি পদক্ষেপের প্রয়োজন
মেছোবিড়াল আন্তর্জাতিকভাবে সংকটাপন্ন হিসেবে তালিকাভুক্ত, এবং দেশের বন্যপ্রাণী আইনে এটি সংরক্ষিত। তবে আইনি পদক্ষেপ গ্রহণের ক্ষেত্রে তেমন কার্যকর ব্যবস্থা নেই। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, মেছোবিড়াল রক্ষায় শুধু আইনই যথেষ্ট নয়; মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে এবং স্থানীয়দেরকে এর উপকারিতা বোঝাতে হবে।
মেছোবিড়াল সংরক্ষণের জরুরি পদক্ষেপ
প্রাণীটি সংরক্ষণের জন্য বন বিভাগের উচিত একটি কার্যকর পরিকল্পনা তৈরি করা। শুধু বড় বন্যপ্রাণীর সংরক্ষণের জন্য নয়, ছোট প্রাণীদেরও সমান গুরুত্ব দেওয়া উচিত। মেছোবিড়াল সংরক্ষণে এখনই উদ্যোগ না নিলে এটি দেশের বন্যপ্রাণী তালিকা থেকে চিরতরে হারিয়ে যেতে পারে।
অধ্যাপক এমএ আজিজের মন্তব্য
গবেষক অধ্যাপক এমএ আজিজ বলেন, মেছোবিড়াল সংরক্ষণে বন বিভাগের সঠিক পরিকল্পনা এবং সরকারের সুনির্দিষ্ট প্রকল্পের অভাবই এই প্রাণীটির সংকটের মূল কারণ। যদি অবিলম্বে ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তবে এটি বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে পৌঁছাবে।
মেছোবিড়াল আমাদের প্রকৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ এবং তার অস্তিত্ব রক্ষা করা সময়ের দাবি। জনসাধারণের সচেতনতা, সরকারি উদ্যোগ এবং আন্তরিক পদক্ষেপের মাধ্যমে এটিকে সংরক্ষণ করা সম্ভব।