৮ লাখ টাকা মূলধনের কোম্পানিকে ১৫০ কোটি টাকা ঋণ

  নিজস্ব প্রতিবেদক
  প্রকাশিতঃ সকাল ০৮:১৬, বৃহস্পতিবার, ১৬ জানুয়ারি, ২০২৫, ২ মাঘ ১৪৩১
এবি ব্যাংকের লোগো
এবি ব্যাংকের লোগো
  • কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হস্তক্ষেপে বন্ধ হয় ঋণ বিতরণ
  • কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পর্যবেক্ষকের ভেটোর পরও ঋণ প্রস্তাব পাঠানো হয় বোর্ডে
  • ঋণ অনুমোদনে সরাসরি হস্তক্ষেপর করেন ব্যবস্থাপনা পরিচালক
  • বিলুপ্ত করা প্রতিষ্ঠানের দায়ও চাপিয়ে দেওয়া হয় নতুন প্রতিষ্ঠানের উপর
  • স্যানেটারি ব্যবসায়ীকে ১৫০ কোটি টাকার ঋণ দিতে তোড়ঝোড়

এবি ব্যাংকের কাকরাইলের ইসলামী ব্যাংকিং শাখার গ্রাহক কোয়ালিটি রি-রোলিং মিলস লিমিটেড। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানটির পরিশোধিত মূলধন মাত্র ৮ লাখ টাকা। অথচ এই প্রতিষ্ঠানকেই ১৫০ কোটি টাকা ঋণ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ। এক্ষেত্রে কোন সহায়ক জামানত প্রস্তাব করেনি ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। শুধু তাই নয়, এবি ব্যাংকের বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যবেক্ষক ঋণ প্রস্তাবটি সন্দেহজন হওয়ায় অনুমোদন থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দিলেও ব্যাংকের সাবেক এমডি তারিক আফজালের কেরামতিতে দুর্বল এই প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দেওয়ার সিদ্ধান্ত বোর্ডে প্রেরণ করা হয়। যদিও পরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হস্তক্ষেপে বিতরণ বন্ধ করে কর্তৃপক্ষ। এক্ষেত্রে এবি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালককে শর্তকও করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক পরিদর্শন প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে প্রতিষ্ঠিত কোয়ালিটি রি-রোলিং মিলস লিমিটেডে ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ওই বছরের মার্চে এবি ব্যাংকের কাকরাইলে ইসলামী ব্যাংকিং শাখায় হিসাব খোলেন। এর এক মাসের মাথায় এপ্রিলে ২৫০ কোটি টাকার পরোক্ষ (নন-ফান্ডেড) ঋণ সুবিধার জন্য আবেদন করেন প্রতিষ্ঠানটি। এই ঋণের অনুমোদনের জন্য কাকরাইল শাখা একই তারিখে কল রিপোর্ট ও তথ্যাদিসহ ইসলামী ব্যাংকিং শাখার বাণিজ্য প্রধানের কাছে প্রেরণ করলে তা সিদ্ধান্তের জন্য সিআরএম ডিভিশনে প্রেরণ করা হয়। 

এরপর ২৮ এপ্রিল শাখা ও প্রধান কার্যালয়ের কর্মকর্তাদের পরিদর্শন প্রতিবেদন ভিত্তিতে প্রকল্পের জন্য ২৫০ কোটি টাকার পরোক্ষ ঋণ সুবিধা ন্যায্যতা না থাকায় প্রকল্প ও আমদানী ব্যবসা পরিচালনার জন্য ১৫০ কোটি টাকা ঋণ সুবিধা প্রদানের অনুরোধ করে। এক্ষেত্রে কোন জামানত প্রস্তাব করা হয়নি। বিষয়টি এবি ব্যাংকের বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে দায়িত্বপ্রাপ্ত পর্যবেক্ষক নির্বাহী পরিচালক জামাল উদ্দিনের দৃষ্টিগোচর হলে সার্বিক বিষয়াদি পর্যালোচনা করে তিনি ঋণ প্রস্তাবটি খুবই সন্দেহজনক বিধায় তা অনুমোদন থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দেন। কিন্তু তারপরও এবি ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক তারিক আফজাল ঋণ প্রস্তাবনা পরিচালনা পর্ষদে উপস্থাপন করার ব্যবস্থা গ্রহণ। এটি ব্যাংক ও আমানতকারীদের স্বার্থের পরিপন্থী ও ঋণ প্রস্তাবটি উদ্দেশ্য প্রণোদিত বলে মনে করে বাংলাদেশ ব্যাংক।

শুধু তাই নয়, ২০২৪ সালের ২৮ মার্চ মেসার্স কোয়ালিটি স্টীলের নাম ও মালিকানা পরিবর্তন করে গড়ে উঠেছিলো কোয়ালিটি রি- রোলিং মিল্স লিমিটেড। নাম পরিবর্তনের আগেই ইউসিবি ব্যাংকের মহাখালী শাখা কোয়ালিটি স্টীলের ঋণ ছিলো ৬৭ কোটি ৫৭ লাখ টাকা। এই দায় পুরোটাই এখন কোয়ালিটি রি- রোলিং মিল্সের ঘাড়ে। ঋণগুলোর মধ্যে মেয়াদী ঋণ ৩৮.২৯ কোটি টাকা, টাইম লোন-৭ কোটি টাকা, সিসি (হাইপো) ২০ কোটি টাকা এবং ব্যাংক গ্যারান্টি ২৮ লাখ টাকা। গ্রাহকের মেয়াদী ঋণ হিসাবটিতে ২টি মাসিক কিস্তি ওভারভিউ রয়েছে রয়েছে বলেও উল্লেখ করে বাংলাদেশ ব্যাংক।

প্রস্তাব করা হয়নি জামানত:

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শন প্রতিবেদনে দেখা যায়, কোয়ালিটি রি-রোলিং মিলস ২০২৪ সালের ১১ জানুয়ারি প্রতিষ্ঠা হওয়ায় এর কোন অডিটেড ফাইন্যান্সিয়াল না থাকায় আর্থিক অবস্থার কোন বিশ্লেষণ পাওয়া যায়নি। এ যাবৎ প্রতিষ্ঠানটি ব্যাংকের সাথে মাত্র ৩ হাজার টাকা লেনদেন করেছে। প্রতিষ্ঠানের পরিচালকের ব্যক্তিগত তথ্যও বিস্তারিত উল্লেখ নেই। প্রস্তাবিত ১৫০ কোটি টাকার এলসি সুবিধার বিপরীতে কোন সহায়ক জামানতও প্রস্তাব করা হয়নি। এছাড়াও, শাখার কল রিপোর্ট অনুযায়ী গ্রাহক প্রতিষ্ঠানটির আইসিআরআর "রেটিং গ্রহণযোগ্য নয়"। শুধু তাই নয় বেসলাইন ইড্রা: লি: এর কর্পোরেট গ্যারান্টি প্রদান করা হলেও এ সংক্রান্ত কোনো বোর্ড রেজুলেশন এবং প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক সামর্থ্য বিশ্লেষণ পরিলক্ষিত হয়নি। এছাড়া, এবি ব্যাংক শাখাটি গ্রাহকের ঋণ অনুমোদনের জন্য কোনো প্রকার ক্রেডিট প্রস্তাব প্রধান কার্যালয়ে প্রেরণ করেনি। কেবলমাত্র কল রিপোর্ট বা গ্রাহকের সংক্ষিপ্ত তথ্যাদি প্রেরণ করা হয়েছে।

কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেছেন যারা:

ব্যাংক থেকে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বেসলাইন ইন্ড্রা. লিমিটেডের প্রতিনিধি পরিচালক হিসেবে কোয়ালিটি রি-রোলিং মিলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্বে রয়েছেন কিরণ কুমার কর্মকার। তিনি ২০২৩ সালের আগস্ট মাস থেকে স্যানেটারি ব্যবসায় নিয়োজিত রয়েছেন বলে বোর্ড সভার ম্যামোতে উল্লেখ রয়েছে। আর বেসলাইন ইন্ড্রাস্ট্রির আরেক পরিচালক পলাশ চন্দ্র শীল এই প্রতিষ্ঠানের পরিচালক। তিনি বিজনেস অপারেশন ম্যানেজমেন্ট ও সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্টে অভিজ্ঞ। ২০২৪ সালের আগস্টের সিআইবি রিপোর্টে পলাশ চন্দ্র শীলের ব্রাক ব্যাংকে ২ কোটি ৪৩ লক্ষ টাকা ঋণ নিম্নমানে খেলাপি। ওই ঋণ আগস্টের মধ্যেই সমন্বয়ের কথা থাকলেও তা সমন্বয় করা হয়নি। 

ব্যবস্থাপনা পরিচালককে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শতর্ক বার্তা:

ব্যাংকটির বর্তমান আর্থিক অবস্থা বিবেচনায় ফান্ডেড ঋণ প্রদান করা সম্ভব নয় বিধায় সিআরএম ডিভিশনের মূল্যায়নের পর ব্যবস্থাপনা পরিচালক নন-ফান্ডেড ঋণ দেওয়ার জন্য উদ্দত হয়েছেন। এজন্য ব্যবস্থাপনা পরিচালকে ভবিষ্যতে এ ধরণের প্রস্তাব বিবেচনায় অধিকতর সতর্কতা অবলম্বন ও পর্যালোচনাপূর্বক ঋণ মঞ্জুরের সুপারিশ করার জন্য শাখা ও সংশ্লিষ্ট সকলকে কঠোর নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে।

তথ্য বলছে, গাজীপুরে কালিয়াকৈরে কোয়ালিটি রি-রোলিং মিলসের কারখানার গেটে ও ভেতরে মেসার্স কোয়ালেটি স্টিল নামে একটি সাইনবোর্ড দেখা যায়। সেখানে থাকা যন্ত্রপাতির বর্তমান সেট-আপ শুধুমাত্র স্কয়ার বার তৈরির জন্য ব্যবহারযোগ্য। বিলেট এই কোম্পানির প্রধান কাঁচামাল, যা স্থানীয়ভাবে সংগ্রহ করা হয়। পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, গ্রাহক তার অপারেশনাল কার্যক্রমের জন্য উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে প্রাসঙ্গিক অনুমতি বা এনওসি গ্রহণ করেনি। এনভায়রনমেন্ট ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেট, কারখানা ও প্রতিষ্ঠানের পরিদর্শন বিভাগের সার্টিফিকেট ইত্যাদি দেখাতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি। এছাড়া গ্রাহক তার কাগজপত্রে প্রতিদিন ২২০ মেট্রিক টন উৎপাদনের হিসাব দিলেও এই প্রতিষ্ঠান থেকে দিনে সর্বোচ্চ ৩০-৪০ মেট্রিক টন পণ্য উৎপাদন করা যাবে বলেও উল্লেখ করা হয় প্রতিবেদনে।

জানা যায়, এই ঋণ অনুমোদনসহ অন্যান্য কার্যক্রম পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন ব্যাংকটির সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক তারিক আফজাল। তার বিরুদ্ধে আরও বেশ কিছু ঋণে অনিয়ম করার অভিযোগ রয়েছে। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর গত ডিসেম্বরে তিনি ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে কানাডায় পাড়ি জমান। সেখান থেকেই গত ৯ ডিসেম্বর ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদ থেকে পদত্যাগ করেন। তিনি আওয়ামী লীগের আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপ-কমিটির সদস্য। আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে জড়িত এই ব্যাংকার গত ৫ অগাস্ট ছাত্র-জনতার গণ আন্দোলনে সরকার পতনের পর থেকে আর প্রকাশ্যে আসেননি। তখন থেকে এবি ব্যাংক থেকে তার পদত্যাগের গুঞ্জন উঠে।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে এবি ব্যাংকের বর্তমান ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও সৈয়দ মিজানুর রহমান বলেন, ঋণের প্রপোজাল থেকে আমরা এই ঋণ দেওয়ার মতো মনে করেছিলাম। পরে বোর্ড এটি অনুমোদন করে বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠালে বাংলাদেশ ব্যাংক তাতে পর্যবেক্ষণ দেয়। এজন্য ঋণ আর অ্যাপ্রুভ হয়নি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পর্যবেক্ষকের নিষেদের পরও ঋণটি কিভাবে বোর্ড পর্যন্ত গেলো জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটা তো ব্যাপার না। ব্যাপার হচ্ছে ঋণটি অ্যাপ্রুভ হয়েছে কিনা?

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র হুসনে আরা শিখা বলেন, এ ধরণের কোন ঘটনা ঘটেছে কিনা জানা নেই। তবে যদি ঘটে থাকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগ পরিদর্শন করে দায়ি ব্যাংকের বিরুদ্ধে ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

Share This Article


ছবি: সংগৃহীত

সাপ্তাহিক লেনদেনের শীর্ষে এডিএন টেলিকম

ছবি: সংগৃহীত

সাপ্তাহিক দরবৃদ্ধির শীর্ষে ডেল্টা স্পিনার্স

ছবি: সংগৃহীত

সাপ্তাহিক দরপতনের শীর্ষে প্রাইম ফাইন্যান্স ফান্ড

ছবি: সংগৃহীত

ব্যবসা-বাণিজ্য তলানিতে, অর্থনীতিতে বাড়ছে চাপ

ছবি: সংগৃহীত

চাল আমদানির প্রভাব নেই খুচরা বাজারে, সঙ্কট তেলের

ছবি: সংগৃহীত

বন্ধ হতে যাচ্ছে সজীব ওয়াজেদ জয়ের ‘বিনিময়’ প্ল্যাটফর্ম

৩৬৮ কোটি টাকার সম্পত্তি জব্দ, আইনি চাপে এস আলম পরিবার

ছবি: নতুন ধ্বনি

বায়িং হাউজের অনিয়ম ধরতে বস্ত্র দপ্তরকে অনুরোধ জানাবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক

ছবি: সংগৃহীত

আমানতকারীকে সুরক্ষা দিতে আসছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বন্ড

ছবি: সংগৃহীত

আলফা ইসলামী লাইফকে ৭ লাখ টাকা জরিমানা

ছবি: সংগৃহীত

এস কে সুরের লকারে ডলার, ইউরো সোনা ও এফডিআরের কাগজ

ছবি: সংগৃহীত

খেলাপি ঋণের সময়সীমা বৃদ্ধি ও সুদহার কমানোর দাবি এফবিসিসিআইয়ের