ব্যবসা-বাণিজ্য তলানিতে, অর্থনীতিতে বাড়ছে চাপ

- অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে সরকারের রাজস্ব ঘাটতির পরিমাণ প্রায় ৫৮ হাজার কোটি টাকা
- ২০২৪ সালের জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ১.৮১% এ নেমে গেছে
- ঋণখেলাপির পরিমাণ বেড়ে ৭৪ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে
- ব্যাংক ঋণের সুদহার ১৬% ছাড়িয়ে যাওয়ার কারণে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ কমে গেছে (৭.৬৬%)
- অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) নিট বিদেশি বিনিয়োগ ৭১% কমেছে
- আইএমএফের শর্ত পূরণ করতে শতাধিক পণ্যে ভ্যাট ও শুল্ক বৃদ্ধি করেছে
- ব্যাংকের সুদহার বৃদ্ধি এবং কর বৃদ্ধির কারণে ব্যবসা পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়েছে
২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে দেশের অর্থনীতি বড় ধরনের চাপের সম্মুখীন হয়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধে সরকারের রাজস্ব ঘাটতির পরিমাণ প্রায় ৫৮ হাজার কোটি টাকা পৌঁছেছে। এ অবস্থায় আয় কমে যাওয়ার কারণে সরকারের পক্ষ থেকে ব্যয় কমানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) বাস্তবায়নও এ বছর সবচেয়ে কম হয়েছে গত পাঁচ অর্থবছরের মধ্যে। একদিকে যেমন দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য শ্লথ, অন্যদিকে ব্যাংকের উচ্চ সুদহারের কারণে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ অনেক কমে গেছে। বিদেশি বিনিয়োগও তিন বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে। এর ফলে সার্বিক অর্থনীতিতে চাপ বাড়ছে, যা অর্থনীতিবিদদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
রাজস্ব ঘাটতি ও অর্থনৈতিক সংকট
চলতি অর্থবছরের শুরু থেকেই দেশের অর্থনীতি ছিল চাপের মধ্যে। জুলাই-আগস্ট মাসে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের কারণে ব্যবসা-বাণিজ্য স্থবির হয়ে পড়লে রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি আরও বাড়ে। এর ফলে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথমার্ধে রাজস্ব ঘাটতি প্রায় ৫৮ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছায়। এছাড়া, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের স্থবিরতা দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধিতে বড় প্রভাব ফেলেছে। ২০২৪ সালের জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়কালে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ১ দশমিক ৮১ শতাংশে নেমে গেছে, যা গত বছরের একই সময়ের ৬ দশমিক ০৪ শতাংশের তুলনায় অনেক কম।
ঋণ প্রবাহ ও সুদহারের প্রভাব
ব্যাংক খাতের পরিস্থিতি আরও সংকটজনক। ঋণখেলাপির পরিমাণ বেড়ে ৭৪ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। ঋণপত্র (এলসি) খোলার জটিলতা এবং ডলার সংকটের কারণে মূলধনি যন্ত্রপাতির আমদানিও কমেছে। নতুন করে খেলাপি ঋণ পুনঃতপশিল সংক্রান্ত নীতিমালা করা হয়েছে, যেখানে ৫০ কোটি টাকার বেশি ঋণ না শোধ করলে সেটিকে মন্দ ঋণ হিসেবে বিবেচনা করা হবে। এছাড়া, সুদহার বাজারের ওপর ছেড়ে দেওয়ার ফলে ব্যাংক ঋণের সুদহার ১৬ শতাংশ ছাড়িয়েছে, যা বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহের পরিমাণ ৭ দশমিক ৬৬ শতাংশে নামিয়ে এনেছে। অর্থনীতির সিংহভাগ বেসরকারি খাতের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ কমে যাওয়ার ফলে ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে।
বিদেশি বিনিয়োগে পতন
বিদেশি বিনিয়োগে বড় ধরনের পতন দেখা গেছে। চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) নিট সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ ৭১ শতাংশ কমে গিয়ে ১০ কোটি ৪০ লাখ ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় অনেক কম। একই সময়ে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা প্রায় ৮৬ কোটি ৫০ লাখ ডলার নিয়ে চলে গেছেন। গত ২০২৩-২৪ অর্থবছরের শেষ প্রান্তিকে বিদেশি বিনিয়োগ ছিল ২৭ কোটি ২২ লাখ ডলার।
মূল্যস্ফীতি এবং শুল্ক-কর বৃদ্ধির প্রভাব
আইএমএফের শর্ত পূরণ করতে সরকার শতাধিক পণ্যে মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) ও শুল্ক বাড়িয়েছে। এর ফলে বাজারে পণ্যের দাম বেড়েছে এবং মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদরা। বিশেষ করে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়াবে। সরকার হুমকি-ধমকি দিয়ে কর আদায় করতে চাচ্ছে এবং ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, সরকারের আচরণ ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
ব্যবসায়ীদের ক্ষোভ
ব্যবসায়ীরা সরকারের এই নীতির বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ। তারা বলছেন, ব্যাংকের সুদহার বাড়ানো এবং কর বৃদ্ধি ব্যবসা পরিচালনা কঠিন করে তুলছে। বিকেএমইএ এবং বিজিএমইএর নেতারা সরকারের শুল্ক-কর বৃদ্ধি এবং ব্যাংক সুদের উচ্চতা নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা করেছেন। তাদের মতে, আইএমএফের শর্ত পূরণের জন্য সরকার যেভাবে কর বাড়াচ্ছে, তা ব্যবসায়ীদের ওপর চাপ তৈরি করছে এবং বাজারে স্থবিরতা সৃষ্টি করছে।
বিশ্ব ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেনও বলেছেন, দেশের অর্থনীতি বর্তমানে খুবই নাজুক অবস্থায় রয়েছে। রেমিট্যান্স, রপ্তানি আয় এবং রিজার্ভ ছাড়া অর্থনীতির অন্যান্য সূচক নেতিবাচক অবস্থায় রয়েছে। বিদেশি বিনিয়োগের পরিমাণ কমে যাওয়ার কারণে দেশের উন্নয়নও থমকে যাচ্ছে।
সার্বিক পরিস্থিতি
বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে সংকটের মধ্যে রয়েছে, যেখানে রাজস্ব ঘাটতি, ঋণখেলাপি বৃদ্ধি, ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতা, কমে যাওয়া বিদেশি বিনিয়োগ এবং মূল্যস্ফীতির চাপ সকল ক্ষেত্রেই নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। সরকার যদি দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নেয়, তবে দেশের অর্থনীতি আরও সংকটের দিকে ধাবিত হতে পারে, যা ভবিষ্যতে আরও বড় সমস্যা তৈরি করতে পারে।